বাঙালির চা প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়ে বাঙালির আপ্যায়নের চা, বাঙালির বিনোদনের চা, মনোরঞ্জনের চা, মাথা ধরলে চা, অসুস্থ লাগলে এমনকি মন খারাপে ও চা। চা জড়িয়ে আছে দেহে মনে আষ্টেপৃষ্ঠে।চা ছাড়া চলতে পারে না বাঙালি এক কদম।
চা বাঙালির জীবনের একটা বড় অঙ্গ, চায়ে জমে আড্ডা,সে খেলার মাঠে, রাজনৈতিক আলোচনা, সাহিত্য আড্ডাতেও।চা পান আজের নয়,চা বাঙালির এক ঐতিহ্যবাহী পানীয়।
এ প্রসঙ্গে চা বাগিচার ইতিহাস ও বহু তথ্য বহুল। দার্জিলিং চা আসাম চা, এখন আর ও অনেক ব্যাপক হয়েছে উৎপাদন ক্ষেত্র। পাহাড়ের ঢালে ছোটো ছোটো ক্ষেত্র তৈরি করা হয়,চা বীজ ফেলার জন্য।চা চারা বেরোলো, সেগুলো তুলে একটু ফাঁকা রেখে রেখে গাছ লাগানো হয়। নারী পুরুষ সমান ভাবে পরিশ্রম করে গাছ উৎপাদন, পরিণত হলে পাতা তোলার কাজ করে। চায়ের এই উৎপাদন প্রণালী ভৌগোলিক পরিস্থিতি পরিবেশের উপর নির্ভরশীল।
ষাট বছর আগেও মানুষের পরিশ্রম বানাতো চা পাতাকে পান করার উপযুক্ত কারণ।
পাতা অল্প গরম জলে ধুয়ে শুকিয়ে হামাল দিস্তায় গুঁড়ো করে,পানের উপযোগী করত,তার হাফ ডাষ্ট ফুল ডাষ্ট করা হতো। মানুষের পরিশ্রম বানাতো সবুজ।
এখন যান্ত্রিক সভ্যতায় সবই করে যন্ত্র, পঞ্চাশ জনের কাজ পাঁচ জনেই হয়ে যায়।বাকিরা বেকার।
বাঙালি জাতি ভাবুক চিন্তাশীল,একটু হেতু পেলেই সেটা নিয়ে মাথার ভেতর জট টাকায় ,আর ক্লান্ত হয়, দেহে মনে। ক্লান্তি দূর করতে চা পান।চা এমনিই পরম বন্ধু। ব্যস্ত মানুষ ট্রেনে বাসে কর্মস্থলে ছোটাছুটি করে ফলে ক্লান্ত হয়ে বিস্বাদ মুখে বিরক্ত হয়, তখনই তাকায় কাছাকাছি চায়ের দোকান যদি থাকে, স্টেশনের গায়ে গজিয়ে ওঠে মন খুশি করা চায়ের দোকান।
মানুষের জমায়েত মানেই অলিখিত ভাবে চায়ের আড্ডা।সে রাজনৈতিক আলোচনায় চা, সাহিত্য আলোচনায় আলোচনার চা,অফিস আদালতের চা। চলচ্চিত্র আড্ডা'যত ভারিক্কি হোক, সেখানে যত রকমারি কফি থাক, এমনকি কফি হাউসের আড্ডাতেও কফির সাথে দুএকবার চা না হলে ঠিক জমে না তো আড্ডা'টা।কত রকমের চা লিকার চা দুধ চা,হাফ জল হাফ দুধ চা,লেবু চা,আদালেবু চা এক এক জনের এক এক রকম পছন্দ।
পাড়ার চায়ের দোকান সকাল সাঁঝে অদৃশ্য হাত ছানি দিতে থাকে,জমে উঠে খোশমেজাজে গল্প আর চায়ের টেক।রকের আড্ডা চায়ের আড্ডায় যোগাযোগ রেখে জীবনের ধারাপাত খোলে।
এই তো গেল বাইরের চায়ের দহরম মহরম।আর অন্দরের চা, সেখানে সর্বক্ষণ সুপ্রভাত হবে "বেড টি"দিয়ে।কেউ খান লিকার চা,কেউ দুধ চা,কেউ আফ দুধ হাফ জল চা,লেবু চা,আদা লেবু দিয়ে চা,বেশি চা পাতা দিয়ে কড়া চা, তন্দুরি চা।যার কাছে যেটা মুখরোচক। "বাঙালির চা বাঙালির দেহে মনে আনে বল।"
সকাল বিকেলে চা তাছাড়া অতিথি অভ্যাগতদের আপ্যায়নে চা।
কঠোর পরিশ্রম মানুষকে ক্লান্ত করে চা তাদের চাঙ্গা করে।সাহিত্যের রস আনে চা, অঙ্কের সমাধানে চলে।
আমরা বৈচিত্র্যময় সম্ভার পাই সব আড্ডার সাথে চায়ের আড্ডাকে জুড়ে। তাই তো বলে" কলমে লাগা চা,ওরে মন দিগ্দিগন্তে যা"।
তবে আজ করোনা ভাইরাস প্রায় তিন মাস মানুষের জীবনের সাধারণ ছন্দে পতন ঘটিয়েছে,মনে বড় দুঃখ,গরীব মানুষের এক বেলা জোটে তো এক বেলা উপোষী। মানুষ রোগে মহামারীতে কাবু,তার সাথে পেটে টান, কর্মহীন।লকডাউনে গৃহবন্দি,বাস ট্রেন চলাচল বন্ধ,চায়ের দোকান হবে কার জন্য।
কেউ বেরোয় না প্রয়োজন ছাড়া,সব আড্ডা'টা অন্তর্হিত হয়েছে অস্তিত্বের অন্তরালে। এখন যেটুকু আড্ডা' ফেসবুকের পাতায়,তবু কিছুটা স্বস্তি,চা পান করি এ আড্ডাতেও একা একা। গুঁড়ো দুধের চা এতো কালের অভ্যাসে ভাঁটা টেনে আনে,তবু সয়ে নিতে হয় বিরহ জ্বালা।
এতো সাধের বাঙালির চায়ের আড্ডা স্বাভাবিক হয়ে দ্রুত ফিরে এসো পথ চেয়ে বসে আছি তোমার অপেক্ষায়...
![]() |
| উমা দে |
সাহিত্যের সন্ধানে'র সাপ্তাহিক ব্লগ প্রতিবেদন
কৌশিক দে (সম্পাদক )
অমৃতা রায় চৌধুরী, সম্রাট দে , অসীম দাস ( সহ সম্পাদক মন্ডলী )






