Saturday, 4 July 2020

বনশ্রী ঘোষ / দক্ষিণ দিনাজপুর




'চা' শব্দটি এক অক্ষরের হলেও অনুভূতি লক্ষ কোটি মানুষের। চা বাঙালির এক ইমোশান বলা যেতে পারে। বাঙালির জন্য চা নাকি চায়ের জন্য বাঙালি তা বলা ভারী মুশকিল। বাঙালির রসনা তৃপ্তির জন্য চায়ের জুড়ি মেলা ভার। তবে বাঙালিরা কিন্তু এত চা বিলাসী ছিল না। শোনা যায়, বাঙালিদের এই চায়ের নেশা নাকি এসেছে ইংরেজদের কাছ থেকে। ইংরেজদের পরিচালিত বিভিন্ন বিঞ্জাপণ দেখেই বাঙালিরা চা পানে আগ্রহী হয়। অনেক ঐতিহাসিক এটিকে 'ইংরেজদের কারসাজি' বলেছেন। এরপরই বাঙালির শরীরে মাদকের মতো মিশে যেতে থাকে চা। চায়ের সাথে বাঙালির প্রথম পরিচয়ের ইতিহাস আজও ছড়িয়ে আছে শহরের আনাচে কানাচে।

ব্যস্ততম বাঙালির কাছে চা এক ঔষধের মতো। সকালের বেড-টি থেকে সন্ধ্যায় অফিসের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর এক কাপ চায়ের চুমুকেই যেন ক্লান্তির অবসান ঘটে। চা'কে কেন্দ্র করেই বসে বাঙালির আড্ডার আসর,রাজনৈতিক বিতর্ক, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ। তখন পাড়ার সেই ছোট চায়ের স্টলটা ও যেন হয়ে ওঠে এক জীবন্ত বৈঠকখানা। ভ্রমণেও সঙ্গী এই চা। ট্রেনের মধ্যে 'চায়ে গরম চায়ে গরম ৫ টাকা লেবু চা' ডাকটা শুনলেই যেন আনন্দে মন নেচে ওঠে। শীতের সকালে লেবু দিয়ে চা এগুলি বাঙালির খুব পচ্ছন্দের।

বাঙালির চা-প্রীতির দিকটিও বড়ো বিচিত্র। 'বাঙালির চা পান ' কে কেন্দ্র করে দিগন্ত সেন, লিখেছেন বাঙালি উনিশ শতকের শেষে এসে ও সেভাবে চায়ের প্রতি আসক্ত ছিলনা। উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে এসে বাঙালি ধীরে ধীরে চায়ের প্রতি মজতে শুরু করে। স্বামী বিবেকানন্দের চা প্রেমের খবর মেলে তাঁর ছোটো ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখায়। তিনি তাঁর স্মৃতিকথা থেকে লেখেন ঔষধ হিসেবে চা পানের কথা। তাঁর 'কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা' বইতে তিনি লিখেছেন :"আমরা যখন খুব শিশু তখন একরকম জিনিস শোনা গেল -চা। সেটা নিরেট কি পাতলা কখন ও দেখা হয়নি। আমাদের বাড়িতে তখন আমার কাকীর প্রসব হইলে তাঁহাকে একটি নল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার ভিতর কুচো পাতার মতন কি দিলে, গরম জল দিলে ,তারপর ঢাললে একটু দুধ চিনি দিয়ে খেলে। আমরা তো দেখে আশ্চর্য, যা হোক দেখা গেল, কিন্তু আস্বাদনটা তখন ও জানিনি। আর লোকের কাছে গল্প, যে একটা আশ্চর্য জিনিস দেখেছি, এই হল প্রথম দর্শন।" তখন চীন থেকে চা আসত। ভারতে চা উৎপাদন শুরু হয়নি তখন। মহেন্দ্রনাথ শেষ লাইনে একটু ভুল তথ্য দিয়েছিলেন। তাঁর জন্মের কয়েকবছর আগে তখনকার ভারতবর্ষে চা উৎপাদন শুরু হয়ে গেছে।

ঐতিহাসিক গৌতম ভদ্র স্বামী বিবেকানন্দের চা প্রীতির একটি বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর লেখায়, তা থেকে বোঝা যায়, নিছক সন্ন্যাসীপনার বশে চা-পানের তৃপ্তিকে তিনি দূরে সরিয়ে রাখতে চাননি :"ক্ষমতা ও লোকনিন্দার থোড়াই কেয়ার করতেন বিবেকানন্দ, তাই ১৮৮৬ সালেই ঠাকুরকে (শ্রীরামকৃষ্ণ) পোড়ানোর রাতেই দরমা জ্বালিয়ে কেটলি করে চা খেয়েই তিনি ও তার গুরুভাইরা রাত কাবার করেছেন। দারুণ অভাবে ও বরাহনগরের মঠে স্বামীজি চা ছাড়েননি। অন্যদের ও ধরিয়েছেন। জেলা কোর্টে দাঁড়িয়ে হলফ করে চা খাওয়ার পক্ষে সওয়াল ও করেছিলেন। " স্বামী বিবেকানন্দের যেমন চায়ের প্রতি টান ছিল, তেমনই তাঁর সমবয়সী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ছিলেন চায়ের প্রতি ভীষণ আগ্রহী। শান্তিনিকেতনে চা-চাক্র বা চা এ পরিপূর্ণ আড্ডার নাম তিনি দিয়েছিলেন 'চাক্র'।

১৯০০ সালে জনৈক গিরীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 'চা প্রস্তুত প্রণালী শিক্ষা' ১১২ পাতার বই লিখে ফেলেছিলেন। বিশের দশক থেকে ইংরেজরা বিভিন্ন রেলস্টেশনে চায়ের স্টল বসায়। সাথে চা পানের উপকারিতা নিয়ে বিঞ্জাপণ ও চা বানানোর প্রথা নিয়ে সবিস্তর আলোচনা প্রকাশ করেন। এভাবেই বাঙালিদের মধ্যে চা পানের প্রবণতা আর ও তীব্র হতে থাকে।

কাজী নজরুল ইসলামের চায়ের প্রতি আগ্রহ রীতিমতো অবাক করার মতো। কিছুক্ষন পর পর চা না খেলে নাকি ওনার চলতই না। কথিত আছে যে যথাযোগ্য চা ও পান দিয়ে তাঁকে একটা ঘরে আঁটকে রেখে বহু গান লিখিয়ে এবং সুর করিয়ে নিয়েছিলেন গ্রামোফোন কোম্পানির কর্মকর্তারা। আর এক কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এক জমিদারকে প্রশ্ন করেন, সে চা খায় কিনা। না বোধক উওর আসায় তাঁর মন্তব্য ছিল, "কিন্তু তোমাকে তো ভদ্র লোকের মতই দেখায়। "

বাঙালির আতিথেয়তা যেন চা ছাড়া অসম্পূর্ণ। এ প্রসঙ্গে গৌতম ভদ্রের লেখায় আমরা পায়, একইভাবে ভদ্রতার সাথে চা পানের অভ্যাসকে মিলিয়ে নিয়েছিলেন রাজশেখর বসু ওরফে পরশুরাম। তিনি নাকি বলতেন:" এক জনের বাড়িতে গেলাম, আর এক কাপ চায়ের দেখা পেলাম না, এই রকম কার ও কাছে কোনও ভদ্রলোকের যাওয়া উচিত নয়।" এরপরই আসে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের চা বিরোধী বিদ্রোহের পালা। ১৯৩৫ সালের ৭ই ডিসেম্বর 'দেশ' পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ "চা-এর প্রচার ও দেশের সর্বনাশ" এ চা চাষ কিভাবে বাংলার অর্থনীতির ক্ষতি করছে তার বিবরণ তিনি দেন।

যাইহোক চা নিয়ে এই বিতর্কের ঝড় কোনোদিনও থামবার নয় বটে। তবে বাঙালি বাড়ির পানীয় হিসেবে চা এক অতুলনীয় জিনিস। ফুটপাতের দোকান থেকে বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ সবখানেই চায়ের জুড়ি মেলা ভার। শুধু লিকার চা নয়, দুধ চিনি মিশিয়ে চা খাওয়ার ব্যপারটিও অজানা ছিলনা। তা মহেন্দ্রনাথের ভাষ্য থেকে টের পাওয়া যায়। সময়ের বিবর্তনের ফলে নতুন ধরণের চা এর চল হল বাঙালিদের মধ্যে তা হল সবুজ চা। সে যাইহোক উনিশ শতক থেকে আধুনিককালে ও সেই চা বাঙালিদের প্রিয় পানীয়ের তালিকায় রয়েছে। সেকালের রব্রীনদ্রনাথের কবিতা থেকে আজকের বাড়ির গৃহিণীদের আকৃষ্ট করে লেখা আবেগঘন কথকতা-কোনো কিছুই চায়ের বিঞ্জাপণে অধরা থাকেনি। বাঙালির চা নিয়ে যত বলা হবে ততই বোধহয় কম। তবে এ এক মাদকতা, নেশা, যা ছাড়া বাঙালি ও বাঙালির আড্ডা অসম্পূর্ণ। সবচেয়ে চা এর প্রতি বাঙালির এই ভালোবাসাকে নিয়ে বলতেই হয়-
 "যাহাতে নাহিক মাদকতা দোষ,
 কিন্তু পানে করে চিও পরিতোষ। "
বনশ্রী ঘোষ























সাহিত্যের সন্ধানে'র সাপ্তাহিক ব্লগ প্রতিবেদন
কৌশিক দে (সম্পাদক )
অমৃতা রায় চৌধুরী, সম্রাট দে , অসীম দাস ( সহ সম্পাদক মন্ডলী )

1 comment: